আলী বেবুল:ইউপি সদস্য থেকে বিয়ানীবাজারের রাজনীতিতে অভিষেক হওয়া রুমা এখন সিলেটের ১৯টি সংসদীয় আসনের একমাত্র সংরক্ষিত সংসদ সদস্য।
অবশেষে সকল জল্পনা -কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সিলেট বিভাগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রুমা রায় চৌধুরী। যিনি রুমা চক্রবর্তী হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত।
সিলেটের ১৯টি সংসদীয় আসনে একমাত্র সংরক্ষিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাকে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাকেসহ দলের চূড়ান্ত হওয়া ৪৮ জন নারীর নাম ঘোষণা করেন।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা মনোনয়ন প্রত্যাশী ১৫৪৯ জনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আলোচনার বাইরে থাকা রুমা চক্রবর্তী ২০০৯ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের প্রথম মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে উপজেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে সামনের সারিতে চলে আসেন।তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল খালিক মায়ন বছর খানেক না যেতেই অসুস্থতা জনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। এরপর অনেক নাটকীয়তা শেষে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রুমা চক্রবর্তী অস্থায়ী চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি প্রায় দীর্ঘ ৪ বছর অস্থায়ী উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও কাজ করেছেন একেবারে তৃণমূলে। ১৯৯৭ সালে ৯নং মুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১ নং ওয়ার্ডের (৭,৮ ও ৯ ওয়ার্ড) সদস্যা হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে মুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ড বিয়ানীবাজার পৌরসভায় যুক্ত হলে ওয়ার্ড কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিয়ানীবাজার পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনারের পদ থেকে পদত্যাগ করে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন এবং বিপুল ভোটে উপজেলার প্রথম মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০১০ সালের নভেম্বর মাসে বিয়ানীবাজার উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত মহিলা আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
রুমা চক্রবর্তীর বর্ণাঢ্য জীবনী:
রুমা চক্রবর্তী বিশ্বনাথ উপজেলার কালিগঞ্জের মৌজপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রবীন্দ্র রায় চৌধুরী ও মাতা সরুজু বালা রায় চৌধুরীর পাঁচ কন্যার মধ্যে তিনি চতুর্থ। বাবা রবীন্দ্র রায় চৌধুরী সিলেট পৌরসভায় ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত (আমৃত্যু) এম. বি. ডাক্তার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
অবিভক্ত ভারতে কাকা (চাচা) গিরিন্দ্র রায় চৌধুরী নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগদান করেন। গোপন বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি নিখোঁজ হন।
রুমা চক্রবর্তী একাত্তরে স্কুলছাত্রী ছিলেন। দেশের টানে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এছাড়া আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য আগে থেকেই নিজেকে তৈরি করেন এই সাহসী নারী। বাবা রবীন্দ্র রায় চৌধুরী এবং মা সরজ বালা চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। তিনি ঢাকায় বড় বোনের বাসায় থেকে পড়াশোনা করার কারণে তৎকালীন আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
রুমা মিরপুর হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার প্রশিক্ষণ নেন। মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়েও নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে সহকারী সেবিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন৷ পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কাঠের বন্দুক নিয়ে প্রশিক্ষণ নেন কিশোরী রুমা রায়।
১৯৭৫ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার পৌর এলাকার সুপাতলা গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য রমেন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।বিয়ের পর থেকে তিনি রুমা চক্রবর্তী হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযোদ্ধা রুমা চক্রবর্তী তিন কন্যা শিল্পী চক্রবর্তী, রিমা চক্রবর্তী ও রিক্তা চক্রবর্তী এবং একমাত্র ছেলে রিপন চক্রবর্তী সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন। তিন কন্যা গৃহিনী।
বিয়ানীবাজার উপজেলাবাসী পেলেন দু’জন সংসদ সদস্য————
রুমা সংরক্ষিত সংসদ সদস্য মনোনীত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলাবাসী পেলেন দু’জন সংসদ সদস্য। সদ্য সমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ২৩৪ সিলেট- ৬ ( গোলাপগঞ্জ – বিয়ানীবাজার) আসন থেকে ৫ম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নাহিদ ও রুমা বিয়ানীবাজার পৌরসভার নাগরিক।
উল্লেখ্য সিলেট বিভাগ থেকে প্রায় ৬০ নারী ছিলেন সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়ার দৌঁড়ে। তন্মধ্যে মনোনয়ন জমা দেওয়া নেত্রীদের মধ্যে আলোচনায় ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র প্রয়াত বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের স্ত্রী ও সিলেট মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসমা কামরান, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমের স্ত্রী, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাজনীন হোসেন, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব সভাপতি ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাসিনা বেগম চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ড. নাজিরা চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুব মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডেইজি সারোয়ার, মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য সাবিনা আনোয়ার, প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের পুত্র ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য আজিজুস সামাদ আজাদ ডনের স্ত্রী মুমতাহিনা ঋতু, সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট শামছুন নাহার শাহানা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা মুকুটের স্ত্রী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুসনা হুদা।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নপত্র বিক্রি করে আওয়ামী লীগ। তিন দিনে মোট ১৫৪৯ ফরম বিক্রি করেছে দলটি। যা থেকে আয় হয়েছে সাত কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
মূলত জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। একেকটি রাজনৈতিক দল ছয়টি আসনের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন পান। এ হিসেবে নিজেদের এবং স্বতন্ত্রদের সমর্থন পাওয়ায় আওয়ামী লীগ পেয়েছে মোট ৪৮ আসন।